আমার এক ছাত্রী, রিনা, কোর্স শেষ করার দিন আমাকে একটু চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করেছিল, "দাদা, সার্টিফিকেট তো পেলাম, কিন্তু এবার এটা দিয়ে হবেটা কী?" প্রশ্নটা খুব সৎ, আর প্রায় সবার মনেই আসে। আমরা কোর্স করি ঠিকই, কিন্তু "এর পর কী" সেটা পরিষ্কার না হলে মনে একটা খচখচানি থেকে যায়। তাই আজ চা-এর কাপ হাতে নিয়ে, একদম মন খুলে বলি - যোগ ভলান্টিয়ার কোর্সের পর আসলে কী কী দরজা খোলে।
আগে একটা সৎ কথা বলে নিই
আমি আপনাকে মিথ্যে স্বপ্ন দেখাব না। যোগ ভলান্টিয়ার সার্টিফিকেট কোনো জাদুর কাঠি নয় যে কাল থেকেই লাখ টাকা আসবে। এটা ভারতের সরকারি যোগ কাঠামোর প্রথম, ভিতের ধাপ - যোগ সার্টিফিকেশন বোর্ড (YCB) আর আয়ুষ মন্ত্রকের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ঠিক এই ভিতটাই আপনাকে এমন কিছু জায়গায় পৌঁছে দেয়, যেখানে বিনা স্বীকৃতিতে ঢোকা কঠিন। চলুন দেখি কোথায় কোথায়।
প্রথম সুযোগ: স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
আজকাল অনেক স্কুল ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিয়মিত যোগ ক্লাস চায়। কিন্তু তারা যাকে-তাকে ডাকে না - বিশেষ করে বাচ্চাদের ব্যাপারে অভিভাবকরা স্বীকৃত যোগ্যতা দেখতে চান। এখানেই আপনার YCB/আয়ুষ-যুক্ত সার্টিফিকেট কাজে লাগে। মফস্সল হোক বা শহর, স্কুলে সকালের যোগ সেশন নেওয়া একজন নতুন ভলান্টিয়ারের জন্য চমৎকার শুরু।
দ্বিতীয় সুযোগ: হাউজিং সোসাইটি ও কমিউনিটি গ্রুপ
আমাদের পাড়ায় পাড়ায় এখন সকালের যোগ গ্রুপ গজিয়ে উঠছে। বহু আবাসন কমপ্লেক্স একজন নিয়মিত যোগ শিক্ষক খোঁজে যিনি বয়স্কদের সামলাতে পারেন, সবাইকে নিরাপদে রাখতে পারেন। আপনি চাইলে নিজেই একটা ছোট মর্নিং গ্রুপ শুরু করতে পারেন - পার্কে, ছাদে, কমিউনিটি হলে। ধীরে ধীরে মুখে মুখে নাম ছড়ায়, আর সেটাই বড় হয়ে ওঠে।
তৃতীয় সুযোগ: এনজিও ও সরকারি স্বাস্থ্য ক্যাম্প
এই জায়গাটা অনেকে ভুলে যান। নানা এনজিও আর সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে যোগ একটা বড় অংশ - বিশেষত গ্রামে, বস্তিতে, যেখানে সাধারণ মানুষের কাছে সুস্থতা পৌঁছে দেওয়া দরকার। এখানে কাজ করলে রোজগারের পাশাপাশি যে সেবার তৃপ্তি মেলে, তা টাকায় মাপা যায় না। আমি নিজে একটা গ্রামীণ ক্যাম্পে গিয়ে যা শিখেছি, তা কোনো বইয়ে নেই।
চতুর্থ সুযোগ: ওয়েলনেস সেন্টার ও জিম
শহরের ওয়েলনেস সেন্টার, স্পা আর আধুনিক জিমেও এখন যোগের চাহিদা বাড়ছে। অনেকে ফিটনেসের পাশাপাশি যোগের শান্ত দিকটা চান। একজন স্বীকৃত ভলান্টিয়ার হিসেবে আপনি এখানে সহকারী হিসেবে শুরু করতে পারেন, অভিজ্ঞতা বাড়াতে পারেন, আর তারপর এগিয়ে যেতে পারেন।
সবচেয়ে বড় সুযোগ: এগিয়ে যাওয়ার পথ
রিনাকে আমি যেটা বলেছিলাম, সেটাই আপনাকে বলি - ভলান্টিয়ার হলো শুরু, শেষ নয়। এটা একটা সৎ প্রথম সিঁড়ি। একবার এটা হাতে পেলে আপনি যোগ প্রোটোকল ইনস্ট্রাক্টর আর তার উপরের স্তরে উঠতে পারেন, যেখানে দায়িত্ব আর আয়, দুটোই বাড়ে। কোন স্তরটা আপনার জন্য ঠিক, সেটা বুঝতে আমাদের সৎ তুলনাটা পড়ে দেখুন - ভলান্টিয়ার বনাম প্রোটোকল ইনস্ট্রাক্টর।
আর যাঁরা এখনও ভাবছেন কোর্সে ঠিক কী শেখানো হয়, তাঁরা আমাদের সিলেবাস আলোচনা দেখে নিতে পারেন - তাহলে এই সুযোগগুলোর জন্য আপনি কতটা তৈরি হচ্ছেন, তা স্পষ্ট হবে।
একটা ছোট গ্রুপ থেকে কীভাবে বড় কিছু গড়ে ওঠে
রিনার মতো অনেকে ভাবে, "একটা সার্টিফিকেট দিয়ে কি সত্যিই কিছু হয়?" তাই আসল ছবিটা দেখাই। বেশিরভাগ ভলান্টিয়ারের যাত্রা শুরু হয় খুব ছোট থেকে - পাড়ার পার্কে চার-পাঁচজন নিয়ে একটা সকালের গ্রুপ। কিন্তু এই ছোট শুরুটাই আসল জাদু:
- প্রথমে মুখে মুখে নাম ছড়ায় - একজন উপকৃত হলে, সে আরও পাঁচজনকে নিয়ে আসে।
- তারপর স্কুল বা সোসাইটি ডাকে - কারণ তারা একজন স্বীকৃত, ভরসাযোগ্য মানুষ খোঁজে।
- ধীরে ধীরে একটা নিয়মিত পরিচিতি তৈরি হয় - "ওই তো আমাদের যোগ দিদি/দাদা।"
- আর তখনই সম্মান আর রোজগার, দুটোই স্বাভাবিকভাবে আসতে থাকে।
আমি নিজে এটা বহুবার দেখেছি। বড় কিছু কখনও বড় থেকে শুরু হয় না, ছোট থেকেই হয়। শুধু প্রথম পদক্ষেপটা নিতে হয়।
রোজগারের পাশে যে জিনিসটা টাকায় মাপা যায় না
আমি কেরিয়ারের কথা অনেক বললাম, কিন্তু একটা সৎ কথা না বললে অন্যায় হবে। এই কাজে যে মনের তৃপ্তি মেলে, তা কোনো বেতনে মাপা যায় না। যখন একজন বয়স্ক মানুষ আপনার ক্লাসে এসে আবার সহজে উঠতে-বসতে পারেন, যখন একটা চাপে থাকা ছেলে শান্ত নিঃশ্বাস ফেলতে শেখে - সেই মুহূর্তের আনন্দ অন্যরকম। এটা আমাদের পুরনো ভারতীয় ভাবনা, "সবার মঙ্গল হোক।" একজন ভলান্টিয়ার হিসেবে আপনি রোজ এই ভাবনাটা বাঁচেন - কোনো মঞ্চে নয়, নিজের পাড়াতেই। রোজগার আর সেবা যখন একসঙ্গে আসে, তখন কাজটা আর নিছক চাকরি থাকে না, একটা ডাক হয়ে ওঠে।
ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়?
হ্যাঁ, আর এটাই আমি অনেক ব্যস্ত মানুষকে এই পথে আসতে বলি। কোর্সে রেকর্ডেড ক্লাস থাকে যা নিজের সময়মতো দেখা যায়, আর লাইভ সেশনে আসল শিক্ষক সন্দেহ মেটান। চাকরি বা সংসার সামলেও, কয়েক সপ্তাহের আংশিক সময়ের পড়াশোনায় বেশিরভাগ মানুষ আরাম করে শেষ করে ফেলেন।
প্রথম পদক্ষেপটাই সবচেয়ে বড় বাধা
আমি বহু মানুষকে দেখেছি যাঁরা মাসের পর মাস শুধু ভেবেই যান - "করব কি করব না", "হবে কি হবে না"। আর এই ভাবনাতেই মূল্যবান সময় পেরিয়ে যায়। সত্যি বলতে, সবচেয়ে বড় বাধা কোনো যোগ্যতা নয়, টাকা নয়, সময়ও নয় - সবচেয়ে বড় বাধা হলো ওই দ্বিধা। রিনাও প্রথমে অনেক দিন দ্বিধায় ছিল। যেদিন সে শুধু একটা ছোট সিদ্ধান্ত নিল - "ঠিক আছে, শুরু তো করি" - সেদিন থেকেই সব বদলাতে লাগল। আপনার মনে যদি এই দ্বিধা থাকে, তবে জেনে রাখুন, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দ্বিধাকে আপনার স্বপ্নের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে দেবেন না।
শেষে, মন থেকে দু'টো কথা
আমি জোর দিয়ে বলব না যে এই কোর্স আপনাকে রাতারাতি বড়লোক বানাবে। বরং সত্যি কথা হলো - এটা আপনাকে একটা পরিষ্কার, সম্মানজনক শুরু দেবে, কিছু আসল দরজা খুলে দেবে, আর সেই শান্ত আত্মবিশ্বাস দেবে যাতে আপনি চার-পাঁচজনের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, "আসুন, শুরু করি।" আমাদের অনেকের কাছেই এই প্রথম পদক্ষেপটাই সবচেয়ে কঠিন - আর সবচেয়ে মূল্যবান।
রিনা আজ একটা স্কুলে আর একটা সোসাইটিতে যোগ শেখায়, আর নতুনদের বলে, "শুরুতে আমিও তোমাদের মতোই ভাবতাম, কী হবে এটা দিয়ে - এখন বুঝি, অনেক কিছু হয়।" পড়তে পড়তে যদি আপনার মনও ভিতর থেকে সায় দিচ্ছে, তাহলে সেই কণ্ঠস্বরটা শুনুন। তৈরি মনে হলে স্বস্তি ভারতের সঙ্গে Yoga Volunteer Course একবার দেখে নিন। সময় নিন, প্রশ্ন করুন, আর যেখানে আছেন সেখান থেকেই শুরু করুন। ম্যাট সবসময় আপনার অপেক্ষায় - আমরাও।